খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ই জানুয়ারি ২০১৫, ১১:১৮ এএম
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত রাঙামাটি পার্বত্য জেলা কেবল তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই অনন্য নয়, এর নামকরণের ইতিহাসও অত্যন্ত চমৎকার এবং বৈচিত্র্যময়। ভূতাত্ত্বিক গঠন, প্রকৃতি এবং লোককাহিনীর এক অপূর্ব মেলবন্ধনে গড়ে উঠেছে এই জনপদের নাম। নিচে এর নামকরণের ইতিহাস ও বিবর্তনের তথ্য উপাত্ত বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:

Table of Contents
রাঙামাটির নামকরণের সবচেয়ে বৈজ্ঞানিক ও গ্রহণযোগ্য যুক্তিটি পাওয়া যায় এর মাটির গঠনে। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, প্রাগৈতিহাসিক টারশিয়ারি (Tertiary) যুগে এই অঞ্চলের পর্বতরাজি ও পাহাড়ি ভূমিরূপ গঠিত হয়েছিল। এই বিশেষ যুগের গিরিমৃত্তিকা বা পাহাড়ের মাটির প্রধান বৈশিষ্ট্য ও ব্যতিক্রম হলো এর গাঢ় লালচে রঙ। চাকমা, মারমাসহ স্থানীয় পাহাড়ি ভাষায় লাল রঙকে সাধারণত ‘রাঙা’ বলা হয়। মাটি লাল বা রাঙা হওয়ার কারণেই প্রাচীনকাল থেকে এই বিস্তৃত পাহাড়ি জনপদটি মানুষের কাছে ‘রাঙামাটি’ (অর্থাৎ লাল মাটির দেশ) নামে পরিচিতি পায়।
প্রকৃতিসূচক এই নামকরণের পেছনে স্থানীয় বয়োবৃদ্ধদের মুখে এবং লোকসংস্কৃতিতে আরেকটি জোরালো কথাপরম্পরা প্রচলিত আছে। বর্তমান রাঙামাটি জেলা শহরের ভৌগোলিক অবস্থানটি এক সময় ছিল অনাবাদী টিলার সমষ্টি এবং অসংখ্য উপত্যকার এক বিস্ময়ভূমি। এই এলাকার দুই পাশে দুটি পাহাড়ি ছড়া বা ঝরনা প্রবহমান ছিল:
পূর্বের ছড়া (রাঙামাটি ছড়া): জেলা সদরের পূর্বদিকে অবস্থিত এই ছড়াটির স্বচ্ছ পানি যখন পাহাড়ের ঢাল বেয়ে লাল মাটির ওপর দিয়ে তীব্র বেগে নিচে নেমে আসত, তখন প্রপাতের জলকে দূর থেকে রক্তিম বা লাল দেখাত। এই অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণে স্থানীয়রা এই ছড়াটির নাম দেয় ‘রাঙামাটি’।
পশ্চিমের ছড়া (রাঙাপানি ছড়া): জেলা শহরের পশ্চিম পাশে অনুরূপ আরেকটি পাহাড়ি ছড়া ছিল। একই প্রাকৃতিক কারণে এর জলকেও লালচে দেখাত বলে এর নামকরণ করা হয়েছিল ‘রাঙাপানি’।
এই দুই রাঙা ছড়ার মোহনার বাঁকেই মূলত গড়ে উঠেছিল আজকের রাঙামাটি শহর। ১৯৬০-এর দশকে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে সৃষ্ট কৃত্রিম হ্রদের পানির নিচে এই দুটি ঐতিহাসিক ছড়া চিরতরে নিমজ্জিত হয়ে যায়। তবে হ্রদের তলে হারিয়ে গেলেও এই দুই ছড়া—’রাঙামাটি’ ও ‘রাঙাপানি’র নাম থেকেই এই অঞ্চলের নাম স্থায়ীভাবে ‘রাঙামাটি’ হিসেবে রয়ে গেছে।
রাঙামাটির নামকরণের সাথে এর প্রশাসনিক নামকরণের বিবর্তনের ইতিহাসও জড়িত। জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার আগে এই অঞ্চলের নাম কয়েকবার পরিবর্তিত হয়েছে:
কার্পাস মহল (১৭১৫ – ১৮৬০): মুঘল ও প্রাথমিক ব্রিটিশ আমলে এই পার্বত্য অঞ্চলটি ‘কার্পাস মহল’ নামে পরিচিত ছিল। কার্পাস শব্দের অর্থ তুলা। সে সময় এই অঞ্চলের পাহাড়ে প্রচুর পরিমাণে কার্পাস বা তুলার চাষ হতো এবং এই তুলাই ছিল রাজস্ব আদায়ের মূল উৎস। এই প্রাচুর্যের কারণে ব্রিটিশরা একে কার্পাস মহল নামে নথিভুক্ত করে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা (১৮৬০): ১৮৬০ সালের ২০ জুন ব্রিটিশ সরকার কার্পাস মহলের প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তন করে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—এই তিন পাহাড়ি অঞ্চলকে একত্রিত করে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম’ (Chittagong Hill Tracts) জেলা সৃষ্টি করে। এর প্রশাসনিক সদর দফতর প্রথমে চন্দ্রঘোনায় স্থাপন করা হলেও পরবর্তীতে ১৮৬৮ সালে তা রাঙামাটি শহরে স্থানান্তরিত হয়।
রাঙামাটি পার্বত্য জেলা (১৯৮৩): পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা থেকে ১৯৮১ সালে বান্দরবান এবং ১৯৮৩ সালে খাগড়াছড়িকে পৃথক জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর ফলে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার মূল অংশটি ১৯৮৩ সালে ‘রাঙামাটি পার্বত্য জেলা’ নামে তার আধুনিক রূপ লাভ করে।

আজকের দিনেও এই জেলার ঐতিহ্যগত রাজস্ব ও সামাজিক শাসন ব্যবস্থায় ‘চাকমা সার্কেল চিফ’ বা চাকমা রাজার নিয়মতান্ত্রিক রাজপ্রথা চালু রয়েছে। ফলে কোটি বছরের পুরনো টারশিয়ারি যুগের লাল মাটি আর ইতিহাসের বাঁক পেরিয়ে আসা রাঙামাটি নামটি আজ কেবল একটি ভৌগোলিক পরিচয় নয়, বরং এটি এই অঞ্চলের আদিম ঐতিহ্য ও প্রকৃতির এক জীবন্ত স্মারক।
মন্তব্য