খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ই জানুয়ারি ২০১৫, ১২:২৪ পিএম
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত রাঙামাটি পার্বত্য জেলা কেবল তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই অনন্য নয়, এর অর্থনৈতিক কাঠামোও দেশের অন্য সব জেলার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। চট্টগ্রাম থেকে মাত্র ৭৭ কিলোমিটার দূরের এই পাহাড়ি জনপদটি একদিকে যেমন ঐতিহ্যের জুম চাষকে ধরে রেখেছে, অন্যদিকে কাপ্তাই হ্রদ আর পর্যটনকে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে উঠেছে আধুনিক কর্মসংস্থান। ২২°৩৮’ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯২°১২’ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত ১৪ মিটার উচ্চতার এই শহরটি পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু।

Table of Contents
পাহাড়ে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস ঐতিহ্যবাহী জুম চাষ। বছরের পর বছর ধরে পাহাড়ে এই বিশেষ পদ্ধতিতে তারা ধান, তুলা, ভুট্টা ও সরিষার ফলন ঘরে তুলছেন। তবে সময়ের সাথে সাথে এখানকার পাহাড়ি কৃষিতে এসেছে বড় ধরনের আধুনিকায়ন।
পাহাড়ের ঢালে ঢালে এখন গড়ে উঠেছে বিশাল সব ফলদ বাগান। রাঙামাটির মিষ্টি আনারস ও রসালো কাঁঠালের খ্যাতি এখন দেশজুড়ে। এগুলো স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে প্রতিদিন সমতলের জেলাগুলোতে সরবরাহ করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এখানকার অর্থনীতিতে নতুন এক বিপ্লব এনেছে কাজুবাদাম চাষ। পাহাড়ি আবহাওয়া কাজুবাদাম ও কফির জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় স্থানীয় চাষিরা এখন এই অর্থকরী ফসলের দিকে ঝুঁকছেন, যা তাঁদের জীবনযাত্রার মান বদলে দিচ্ছে। এর পাশাপাশি আম, কলা, লিচু ও জামের মতো মৌসুমি ফলের ব্যাপক উৎপাদন এই অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখছে।
১৯৬০-এর দশকে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য কৃত্রিম কাপ্তাই হ্রদ তৈরি করা হলেও, এটি এখন রাঙামাটির মানুষের জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস। বিশাল এই হ্রদকে কেন্দ্র করে জেলাটিতে একটি বড় মৎস্যজীবী গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। হ্রদের স্বাদু পানির মাছ স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি চট্টগ্রামের বাজারসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চালান করা হয়। মাছ ধরা, নৌকা চালানো, শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং জাল বোনার মতো কাজের সাথে এখানকার হাজার হাজার পরিবার জড়িত।
পাহাড়ি জেলা হলেও রাঙামাটিতে দেশের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চন্দ্রঘোনায় অবস্থিত কর্ণফুলী পেপার মিলস (কেপিএম)। এক সময় এটি এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম কাগজ কল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল, যা এই অঞ্চলের শত শত মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে। এছাড়া কাপ্তাইয়ে রয়েছে দেশের একমাত্র পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র, যা জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে। এর বাইরে রেয়ন কল, ঘাগড়া বস্ত্র কারখানা এবং বিভিন্ন হস্তশিল্পের ছোট ছোট কারখানা এই জেলার মানুষের আয়ের বিকল্প উৎস হিসেবে কাজ করছে।
রাঙামাটির অর্থনীতিতে উপজাতীয় বেইন শিল্প বা কোমর তাঁতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীরা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘পিনন-হাদি’সহ বিভিন্ন রঙিন চাদর ও ব্যাগ তৈরি করেন, যা পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। বাঁশ ও বেতের তৈরি দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসপত্র, শৌখিন আসবাবপত্র এবং ঐতিহ্যবাহী হাতির দাঁতের কারুকাজ এই অঞ্চলের হস্তশিল্পের সমৃদ্ধ ধারাকে টিকিয়ে রেখেছে। এই কুটির শিল্পগুলো পাহাড়ি নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলছে।
সাজেক ভ্যালি, ঝুলন্ত সেতু, শুভলং ঝরনা এবং কাপ্তাই হ্রদের চারপাশের নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক রাঙামাটিতে ভিড় করেন। এই পর্যটনকে কেন্দ্র করে জেলায় হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট এবং রেস্তোরাঁ ব্যবসা এক অভাবনীয় গতি পেয়েছে। কাপ্তাই হ্রদে পর্যটকদের ঘোরানোর জন্য শত শত বোট বা ইঞ্জিনচালিত নৌকা তৈরি হয়েছে, যা স্থানীয় যুবকদের জন্য আয়ের এক চমৎকার পথ খুলে দিয়েছে। গাইড, পরিবহন চালক এবং স্থানীয় হস্তশিল্প বিক্রেতাদের দৈনিক আয় এখন অনেকাংশেই পর্যটন মৌসুমের ওপর নির্ভর করে।

রাঙামাটির এই অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যের পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ইতিহাস। ব্রিটিশ আমলে ১৮৬০ সালের ২০ জুন রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—এই তিন অঞ্চলকে নিয়ে যখন প্রথম জেলা গঠিত হয়, তখন এর নাম ছিল ‘কার্পাস মহল’। এই নাম থেকেই বোঝা যায় সে সময় তুলার ব্যবসা এই অঞ্চলের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি ছিল। পরবর্তীতে ১৯৮১ সালে বান্দরবান এবং ১৯৮৩ সালে খাগড়াছড়ি আলাদা জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে, মূল অংশটি রাঙামাটি পার্বত্য জেলা হিসেবে তার নিজস্ব রূপ পায়। এখনো প্রথাগত রাজস্ব আদায়ের জন্য এখানে চাকমা সার্কেল চিফ বা চাকমা রাজার প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু রয়েছে, যা এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজস্ব ঐতিহ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
মন্তব্য