খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ই জানুয়ারি ২০১৫, ১২:৪৪ পিএম
মেঘ-পাহাড়ের দেশ রাঙামাটির আসল পরিচয় লুকিয়ে আছে এখানকার রান্নার চিরায়ত অভ্যাসে। পাহাড়ি সংস্কৃতির খাবার মানেই কেবল ঝাল বা শুঁটকি নয়; এর পেছনে রয়েছে হাজার বছরের এক জীবনসংগ্রাম ও প্রকৃতির সাথে টিকে থাকার গল্প। পাহাড়ি ও বাঙালি সংস্কৃতির মেলবন্ধনে রাঙামাটির খাদ্য তালিকায় রয়েছে এমন কিছু অনন্য স্বাদ, যা সমতলের সাধারণ খাবার থেকে একদম আলাদা। এখানকার প্রতিটি পদের রন্ধনশৈলী এতই অনন্য যে, তেল-মশলার রাজত্বে অভ্যস্ত মানুষের কাছে এটি এক সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা।
Table of Contents

পাহাড়ি রান্নার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তেলের অনুপস্থিতি এবং উপাদানের সতেজতা। জুম পাহাড় থেকে সদ্য তোলা পাতা, কাঁচামরিচ আর জুমের চালই এখানকার রসুইঘরের মূল চালিকাশক্তি।
রাঙামাটির এই আইকনিক খাবারটি তৈরির প্রক্রিয়াটি বেশ নান্দনিক। মূলত কচি ‘বড়াক’ বা ‘মিটিংগা’ বাঁশ কেটে ভেতরটা পরিষ্কার করা হয়। এরপর দেশি মুরগির টুকরোকে স্থানীয় ধনেপাতা (যা সমতলের চেয়ে অনেক বেশি সুগন্ধি), কাঁচামরিচ বাটা, আদা-রসুন এবং সামান্য লবণ দিয়ে মাখানো হয়। কোনো তেল না দিয়ে মাংসের এই মিশ্রণটি বাঁশের ভেতরের ফাঁপা অংশে ঠুসে ঠুসে ভরা হয়। মুখটি কলাপাতা বা খড় দিয়ে শক্ত করে চেপে কাঁচা কাঠ কিংবা কয়লার আগুনে পুড়তে দেওয়া হয়। আগুনের তাপে বাঁশের ভেতরের কাঁচা রস বাষ্প হয়ে মাংসকে সেদ্ধ করে। যখন বাঁশের বাইরের অংশটি পুড়ে কালো হয়ে যায়, তখন ভেতরের মাংস তৈরি। বাঁশের সেই ধোঁয়াটে সুবাস মাংসের প্রতিটি ছিবড়েতে এমনভাবে মিশে যায়, যা একবার খেলে ভোলা মুশকিল।
চাকমা ও মারমা সম্প্রদায়ের আরেকটি চমৎকার রান্না হলো কলাপাতা বা ‘হিলচিম’ পাতায় মুড়িয়ে কয়লার তাপে সেদ্ধ করা। ছোট মাছ, মাশরুম কিংবা শুঁটকিকে পাহাড়ি মসলা ও লবণ দিয়ে মেখে কলাপাতায় কয়েক স্তর করে মোড়ানো হয়। এরপর চুলার ছাইয়ের নিচে বা কয়লার ওপর রেখে দমে রান্না করা হয়। এই পদ্ধতিতে খাবারের নিজস্ব পুষ্টিগুণ ও রস একদম অক্ষুণ্ন থাকে।
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর খাবারে শুঁটকি এক অপরিহার্য উপাদান। কাপ্তাই হ্রদের ছোট মাছ রোদে শুকিয়ে, গুঁড়ো করে কলার পাতায় মুড়িয়ে মাটির পাত্রে গেঁজিয়ে (Fermentation) তৈরি করা হয় এক বিশেষ পেস্ট, যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘সিদল’ বলা হয়। এছাড়া সামুদ্রিক হাঙ্গর শুঁটকিকে ছোট ছোট কিউব করে কেটে কাঁচা বাঁশকোঁড়ল এবং জুমের বিশেষ টক পাতা দিয়ে যে ঝোল রান্না করা হয়, তার তীব্র ঝাঁঝালো স্বাদ ও গন্ধ প্রথমবার খেলে যে কারোরই চোখ-নাক দিয়ে জল এনে দেবে।

পাহাড়ি রান্নার কথা হবে অথচ ‘নাপ্পি’র উল্লেখ থাকবে না, তা হতেই পারে না। মারমা ও তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের রান্নার অন্যতম প্রাণ হলো এই নাপ্পি। এটি মূলত ছোট চিংড়ি বা কুচো মাছ রোদে শুকিয়ে, লবণ দিয়ে পিষে এবং মাসের পর মাস গেঁজিয়ে (Fermentation) তৈরি করা এক ধরণের জমাটবদ্ধ পেস্ট।
সমতলের রান্নায় যেভাবে পাঁচফোড়ন বা গরম মশলা ব্যবহার করা হয়, পাহাড়িদের অনেক রান্নায় নাপ্পি ঠিক সেভাবে স্বাদ ও গন্ধ বাড়ানোর জন্য দেওয়া হয়। প্রথমবার কেউ এর গন্ধ পেলে কিছুটা অস্বস্তিতে পড়তে পারেন, কিন্তু একবার যার মুখে এর স্বাদ লেগে যায়, তার কাছে নাপ্পি ছাড়া অনেক পাহাড়ি ব্যঞ্জনই আলুনি মনে হবে। বিশেষ করে কাঁচা আম বা জুমের তেঁতুল দিয়ে নাপ্পির চাটনি এই অঞ্চলের অত্যন্ত প্রিয় একটি খাবার।

রাঙামাটি শহরের তবলছড়ি বা ভেদভেদি এলাকায় গেলে দেখা মিলবে ‘পিবির ভাতঘর’ কিংবা এই জাতীয় ঐতিহ্যবাহী হোটেলগুলোর। এগুলো কোনো চকমকে রেস্তোরাঁ নয়, কিন্তু দুপুরের দিকে এখানে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। পর্যটকদের পাশাপাশি স্থানীয় লোকেরাও এখানে আসেন ঘরের স্বাদের খোঁজে।
কাঠের বেঞ্চে বসে কলাপাতা বিছানো থালায় যখন জুমের লাল চালের ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত দেওয়া হয়, তার সাথে আসে হরেক পদের পাহাড়ি ভর্তা। জুমের abdominable পাহাড়ে এক ধরণের ছোট গোল বেগুন পাওয়া যায়, সেগুলো পুড়িয়ে কাঁচামরিচ ও শুঁটকি দিয়ে চটকে তৈরি হয় ‘বেগুন ভর্তা’ বা ‘শাবারাং ভর্তা’। কাপ্তাই হ্রদের কাজলি বা কাচকি মাছের চচ্চড়ি আর সাথে পাহাড়ি হাঁসের মাংসের ভুনা—এই সাধারণ মেন্যুটাই রাঙামাটির খাদ্য সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন।

রাঙামাটির প্রধান উৎসব হলো বৈসাবি (বিজু, সাংগ্রাই ও বৈসু)। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে পাহাড়ের ঘরে ঘরে তৈরি হয় এক কালজয়ী পদ— ‘পাজন’ বা ‘পাচন’।
এটি মূলত এক ধরণের মিশ্র সবজি, তবে এর বিশেষত্ব হলো এতে অন্তত ২০ থেকে ৩০ রকমের (অনেক সময় ৪০টিরও বেশি) পাহাড়ি শাকসবজি, মূল ও কন্দ ব্যবহার করা হয়। জুম পাহাড় থেকে সংগৃহীত কাঁচা বাঁশকোঁড়ল, তারা গাছ, হেঙার গুটি, জুমের বেগুন, পাহাড়ি আলু, কাঁঠালের বিচি ও নানা পদের পাহাড়ি পাতার মিশ্রণে কোনো তেল ছাড়া (কিংবা নামমাত্র তেলে) এটি রান্না করা হয়। উৎসবের দিনে ঘরে আসা অতিথিদের এই পাজন দিয়ে আপ্যায়ন করা রাঙামাটির এক প্রাচীন ও পরম পবিত্র ঐতিহ্য।

কাপ্তাই হ্রদ এবং পাহাড়ের ছড়া বা ঝরনাগুলোর কল্যাণে রাঙামাটির মানুষ চমৎকার কিছু প্রোটিনের উৎস পায়, যা সমতলে মেলা ভার।
পাহাড়ি শামুক বা সামুক ভাজি:
পাহাড়ের ঝরনা বা নদী থেকে এক ধরণের ছোট ছোট কালো শামুক সংগ্রহ করা হয়। এগুলোকে ভালোভাবে পরিষ্কার করে, পেছনের অংশটি ভেঙে, রসুন, পেঁয়াজ আর প্রচুর কাঁচামরিচ দিয়ে কড়া ভাজি করা হয়। স্থানীয়দের কাছে এটি অত্যন্ত পুষ্টিকর এবং সুস্বাদু একটি পদ।
পাহাড়ি কাঁকড়া:
কাপ্তাই হ্রদের পাথুরে কোণ থেকে ধরা ছোট কাঁকড়াগুলো পাহাড়ি মশলা ও ধনেপাতা দিয়ে ঝাল করে চচ্চড়ি রান্না করা হয়, যা গরম ভাতের সাথে দারুণ জমে যায়।

পাহাড়ের মিষ্টির ধরনও সমতলের ছানা বা চিনি দিয়ে তৈরি মিষ্টির চেয়ে আলাদা। এখানে মূল মিষ্টি তৈরি হয় জুমের আঠালো চাল (Binni Rice) দিয়ে। এই লাল বা সাদা রঙের আঠালো চাল সেদ্ধ করে কলাপাতা বা এক ধরণের বিশেষ পাহাড়ি পাতায় মুড়িয়ে ভাপে তৈরি করা হয় ‘হুক্কো পিঠা’। এছাড়া এই চালের সাথে নারকেল ও জুমের আখ থেকে তৈরি খাঁটি গুড় মিশিয়ে তৈরি করা হয় চমৎকার সব ঐতিহ্যবাহী পিঠা, যা যেকোনো আধুনিক পেস্ট্রির স্বাদকে হার মানাবে।

রাঙামাটির আবহাওয়া ও উর্বর পাহাড়ি মাটি ফল চাষের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। প্রখর রোদে পাহাড়ের ঢালে যে ফলগুলো পাকে, সেগুলোর মিষ্টির তীব্রতা সমতলের চেয়ে অনেক বেশি।
হানিকুইন আনারস:
রাঙামাটির ঘাগড়া বা নানিয়ারচর এলাকার আনারসের খ্যাতি দেশজুড়ে। এখানকার সবচেয়ে জনপ্রিয় জাত হলো ‘হানিকুইন’। আকারে কিছুটা ছোট হলেও এর কোঁয়াগুলো চড়া হলুদ রঙের এবং স্বাদে মধুর মতো মিষ্টি। কাটার সাথে সাথেই চারপাশ সুবাসে ভরে যায়।
পাহাড়ি কলা ও এর ঐতিহ্য:
কলা উৎপাদনে রাঙামাটির জুড়ি মেলা ভার। এখানে সাধারণ কলার পাশাপাশি ‘বাংলাকলা’ এবং এক ধরণের পাহাড়ি ‘বুনোকলা’ বা ‘বনকলা’ পাওয়া যায়, যার ভেতরে বড় বড় বীজ থাকে কিন্তু চমত্কার মিষ্টি সুবাস থাকে। প্রাচীন বাংলার কৃষিবিদ খনার সেই বিখ্যাত বচন— “কলা রুয়ে না কেটো পাত, তাতেই কাপড়, তাতেই ভাত”—রাঙামাটির মানুষের জন্য শতভাগ সত্যি। এখানকার জুম চাষিরা ধান চাষের পাশাপাশি পাহাড়ের সীমানাজুড়ে কলার গাছ লাগান, যা সারা বছর তাঁদের নিশ্চিত উপার্জনের পথ তৈরি করে দেয়।
দৈত্যাকৃতির কাঁঠাল:
রাঙামাটির গ্রীষ্মকালের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো এর বিশাল আকৃতির কাঁঠাল। একেকটি কাঁঠাল ওজনে প্রায় ২০ থেকে ৩০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। এই কাঁঠাল শুধু ফল হিসেবেই খাওয়া হয় না, এর বীজ বা ‘আঁটি’ শুঁটকি মাছের সাথে রান্না করে খাওয়া পাহাড়ের মানুষের অন্যতম প্রিয় শীতকালীন পদ।

রাঙামাটির প্রতিটি গ্রাস বা লোকমায় জড়িয়ে থাকে পাহাড়ের আদিম ঘ্রাণ আর মানুষের পরম যত্ন। এখানকার খাবার কেবল পেট ভরায় না, মনকে প্রকৃতির আরও কাছাকাছি নিয়ে যায়।
মন্তব্য